সোমবার, ১৮ মে ২০২৬
প্রথম পাতা » রাজনীতি | শিক্ষা ও ক্যারিয়ার » ডিজিটাল কুরুক্ষেত্রে বাংলাদেশের রাজনীতি: অ্যালগরিদম, মনস্তত্ত্ব ও বাস্তবতার সংঘর্ষ
ডিজিটাল কুরুক্ষেত্রে বাংলাদেশের রাজনীতি: অ্যালগরিদম, মনস্তত্ত্ব ও বাস্তবতার সংঘর্ষ
আরশাদ সিদ্দিকী :
![]()
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট ছিল এক যুগান্তকারী সময়। দীর্ঘ ১৬ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসন, ভোটাধিকার হরণ, গুম-খুন-অপহরণ এবং আর্থিক খাতের নজিরবিহীন দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলন শেষ পর্যন্ত এক অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। আন্দোলন দমনে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন, পেশিশক্তির ব্যবহার এবং শতশত শিক্ষার্থীর ট্রাজিক মৃত্যুর পর জনতার ক্ষোভ এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে রাষ্ট্রযন্ত্রের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ভেঙে পড়ে। ৫ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রীর দেশত্যাগের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের দীর্ঘ এক কর্তৃত্ববাদী অধ্যায়ের অবসান ঘটে।
কিন্তু মজার ব্যাপার হলো—আজকের বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্র সংসদ বা রাজপথ নয়; বরং ডিজিটাল স্পেস। ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক ও এক্স (সাবেক টুইটার)-কেন্দ্রিক এই নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন শুধু মত প্রকাশের মাধ্যম নয়, বরং রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব, জনমত নির্মাণ এবং আধিপত্য বিস্তারের প্রধান অস্ত্র।
ডেটারেপোর্টালের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে ৭ কোটির বেশি সক্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী রয়েছে, যার বড় অংশই তরুণ। ফলে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য সাইবার স্পেস এখন এক ধরনের “ডিজিটাল কুরুক্ষেত্র”।
বর্তমান বাস্তবতায় বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সাইবার উপস্থিতি ও মনস্তত্ত্ব বেশ ভিন্ন। বিএনপি ও তাদের অনুসারীরা সবচেয়ে বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করলেও তাদের প্রচারণা এখনো অনেকাংশে প্রথাগত রাজনৈতিক ভাষার মধ্যে আটকে আছে। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকার পর তাদের সমর্থকদের মধ্যে “দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান” এবং “প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষা” স্পষ্ট। কিন্তু ডিজিটাল যুগে শুধু আবেগসর্বস্ব বক্তৃতা যথেষ্ট নয়; এখানে প্রয়োজন বুদ্ধিবৃত্তিক ও সৃজনশীল যোগাযোগভাষা।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগ এবং তাদের প্রবাসী সমর্থকদের সাইবার তৎপরতা মূলত এক ধরনের “ট্রমা” এবং “ডিনায়াল সাইকোলজি” দ্বারা পরিচালিত। আকস্মিক ক্ষমতাচ্যুতি তাদের মধ্যে যে মানসিক অভিঘাত তৈরি করেছে, তা থেকে বের হতে না পেরে তারা এখনো নিজেদের অতীত শাসনামলের সমালোচনা বা দায় স্বীকারের পরিবর্তে প্রতিপক্ষের ব্যর্থতা তুলে ধরাতেই বেশি মনোযোগী। কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা হলো—কোনো দল যখন অতীতের গুরুতর অভিযোগের জন্য আত্মসমালোচনা বা প্রকাশ্য অনুশোচনা না করে কেবল পাল্টা প্রচারণা চালায়, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা কমতে থাকে।
তাদের সাইবার উইংয়ের প্রযুক্তিগত দক্ষতা নিঃসন্দেহে শক্তিশালী। ভিডিও নির্মাণ, এআই ভয়েস ওভার কিংবা সংগঠিত ডিজিটাল নেটওয়ার্ক ব্যবহারে তারা পেশাদারিত্ব দেখাচ্ছে। কিন্তু নৈতিক গ্রহণযোগ্যতার সংকট তাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ জনমনে এখনো ২০২৪ সালের দমন-পীড়নের স্মৃতি তাজা।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামি ঘরানার দলগুলোর সাইবার উপস্থিতি অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও অনুগত। দীর্ঘদিনের নিপীড়নের অভিজ্ঞতা তাদের সমর্থকদের মধ্যে দৃঢ় আদর্শিক বন্ধন তৈরি করেছে। তবে তাদের বড় সীমাবদ্ধতা হলো—তারা এখনো নিজেদের সমমনা গণ্ডির বাইরে বৃহত্তর সাধারণ জনগণের ভাষায় পৌঁছাতে পারেনি। ডিজিটাল রাজনীতিতে সফল হতে হলে কেবল ধর্মীয় বা আদর্শিক বক্তব্য নয়, অর্থনীতি, নাগরিক অধিকার ও দৈনন্দিন জীবনের বাস্তব সংকট নিয়েও কথা বলতে হয়।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে তরুণদের একটি স্বতঃস্ফূর্ত ডিজিটাল অংশ। এদের প্রধান অস্ত্র হলো মিম, স্যাটায়ার ও হিউমার। তারা প্রথাগত রাজনৈতিক বক্তব্যকে কয়েক সেকেন্ডের ব্যঙ্গাত্মক কনটেন্ট দিয়ে ভেঙে দিতে সক্ষম। এই “মেমেটিক ওয়ারফেয়ার” এখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক যোগাযোগের অন্যতম কার্যকর মাধ্যম। তরুণদের এই ডিজিটাল ভাষা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, কারণ অ্যালগরিদম স্বাভাবিকভাবেই আবেগ, ক্ষোভ ও হাস্যরসকে বেশি গুরুত্ব দেয়।
এখানেই আসে “অ্যালগরিদমিক পোলারাইজেশন” এবং “হাইপার-রিয়েলিটি”-র প্রশ্ন। ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী জ্যঁ বঁদ্রিয়ার দেখিয়েছিলেন, আধুনিক মানুষ বাস্তবতার চেয়ে প্রতীক ও অনুকরণকে বেশি সত্য বলে বিশ্বাস করতে শুরু করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম সেই প্রবণতাকে আরও তীব্র করেছে। একজন ব্যবহারকারী প্রতিনিয়ত এমন কনটেন্টই বেশি দেখেন, যা তার পূর্ববর্তী বিশ্বাস ও মতাদর্শকে শক্তিশালী করে। ফলে প্রত্যেক রাজনৈতিক গোষ্ঠী নিজেদের একটি আলাদা “বাস্তবতা”র মধ্যে বসবাস করতে শুরু করে।
একজন সরকারসমর্থক কেবল সরকারের সাফল্যের গল্প দেখেন, আরেকজন বিরোধী সমর্থক কেবল ব্যর্থতা ও সংকটের খবর দেখেন। উভয়েই মনে করেন—তাদের দেখাটাই পুরো দেশের বাস্তবতা। এই ইকো চেম্বার বা সমমনা পরিবেশ সমাজে এক ধরনের মানসিক বিভাজন তৈরি করছে, যা পারস্পরিক সম্পর্ককেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সোশ্যাল মিডিয়া জনমতকে প্রভাবিত করতে পারলেও এটি নিজে কোনো বিকল্প রাজনৈতিক ক্ষমতা কাঠামো তৈরি করতে পারে না। ভার্চুয়াল উত্তেজনা বাস্তব রাজনৈতিক শক্তির বিকল্প নয়। ইতিহাস দেখিয়েছে, সংগঠিত মাঠের শক্তি, নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং জনগণের আস্থা ছাড়া শুধু ডিজিটাল প্রচারণা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক সফলতা অর্জন সম্ভব নয়।
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—কে ডিজিটাল আবেগকে বাস্তব রাজনৈতিক আস্থায় রূপ দিতে পারবে। কারণ সোশ্যাল মিডিয়ার ট্রাফিক যত বড়ই হোক, তা শেষ পর্যন্ত রাজপথ, সংগঠন এবং জনগণের বাস্তব জীবনের সমস্যার বিকল্প হতে পারে না। ডিজিটাল কুরুক্ষেত্রের এই লড়াই স্ক্রিনের ভেতরে যতই উত্তপ্ত হোক না কেন, বাস্তবতার দেয়ালে আঘাত লাগলে টিকে থাকবে কেবল সেই শক্তিই, যার রয়েছে জনগণের নৈতিক সমর্থন, সাংগঠনিক ভিত্তি এবং বাস্তব সমস্যার সমাধান দেওয়ার




বিচারাধীন মামলা গোপন করে অবৈধ সুপারিশে গণপূর্তের সারওয়ার জাহান বিপ্লব !
শেখর’র ঘনিষ্ঠ সহযোগী সিডিসি জালিয়াতির গডফাদার ক্যাপ: গিয়াস
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিরুদ্ধে ১৮ মাসে ২০০ বিলিয়ন ডলার পাচারের অভিযোগ
দুই হাজার কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় সম্পদ নামমাত্র মূল্যে বিক্রির নায়ক পরিচালক আরিফ উদ্দীন
“চুক্তির আড়ালে কার খেলা? জনগণের অধিকার নাকি বিদেশি করপোরেটের মুনাফা?”
ঢাকার সড়কে এআই ক্যামেরা প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারিতে ফিরছে শৃঙ্খলা
নকল করতে গিয়ে এক্সপেলড: শিবির সমর্থিত প্যানেলের ঢাবি হল সংসদ সদস্য ফেরদাউস
দুর্নীতির গডফাদার কর কমিশনার আবুল বাশার’র খুঁটির জোর কোথায়
ব্রিটিশ রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের আভাস, দ্বিদলীয় ব্যবস্থার অবসান হওয়ার ইঙ্গিত