বুধবার, ১৩ মে ২০২৬
প্রথম পাতা » রাজনীতি | শিক্ষা ও ক্যারিয়ার » রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলাদেশে (পূর্ব বাংলায়) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কেবল সাহিত্যিকই নন, তিনি সুসংহত সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক হাতিয়ারও বটে
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলাদেশে (পূর্ব বাংলায়) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কেবল সাহিত্যিকই নন, তিনি সুসংহত সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক হাতিয়ারও বটে
আরশাদ সিদ্দিকী :
![]()
বাংলাদেশে (পূর্ব বাংলায়) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কেবল সাহিত্যিকই নন, তিনি সুসংহত সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক হাতিয়ারও বটে। বাংলাদেশের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজ রবীন্দ্রনাথকে কেন্দ্র করে যে ‘পবিত্রতার আভা-নান্দনিকতার বিভা’ তৈরি করেছেন— তা আসলে এই ভূখণ্ডের ব্রাত্য-প্রান্তিক তথা নিম্নবর্গের মানুষের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক সহিংসতা (Cultural Violence)-র নামান্তর।
এই সহিংসতা কেবল দৃশ্যত আঘাত নয়, বরং তা একটি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব চিন্তার জগতকে পঙ্গু করে দেওয়ার সুক্ষ্ম প্রক্রিয়া মাত্র। এই সহিংসতার ঘনত্ব ও গভীরতা বুঝতে হলে দীর্ঘ কিতাবেও কুলাবে না। কিন্তু আমরা আপাতত কয়েকটি দিক বোঝার চেষ্টা করতে পারি—
১. জ্ঞানতাত্ত্বিক উচ্ছেদ ও ‘সাংস্কৃতিক নাকচবাদ’
ইতিহাস কাল ধরে পূর্ব বাংলার জনমানুষের নিজস্ব একটি জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামো (Epistemology) ছিল। এই অঞ্চলের মানুষের ধর্মবোধ, তাদের লৌকিক আচার, এবং তাদের যাপিত জীবনের সংকটের ভেতর দিয়ে একধরণের লোকজ সাংস্কৃতিক ধারা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু রবীন্দ্র-বন্দনার নামে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজ এখানে ‘এপিস্টেমিক ভায়োলেন্স’ (Epistemic Violence) বা জ্ঞানতাত্ত্বিক সহিংসতার মাধ্যমে সরাসরি নাকচ করে দিতে চান।
রবীন্দ্রনাথের পরিশীলিত, বাবু-ঘেঁষা এবং উপনিষদীয় (spiritual reality) বা আধ্যাত্মিক বাস্তবতাকে একমাত্র সংস্কৃতিকধারা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সচেতনভাবে সক্রিয়। এর ফলে পূর্ববঙ্গের মানুষের নিজস্ব ভাষা, তাদের ‘অপরিশীলিত’ লোকদর্শন বা লৌকিক মরমীবাদকে ‘নিম্নমানের’ বা ‘সাম্প্রদায়িক’ বলে ছুঁড়ে ফেলে দিতেও তাদের আপত্তি নেই।
Gayatri Spivak-এর ভাষায় বললে, এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে প্রান্তিক বা সাবঅল্টার্ন মানুষের নিজস্ব সংস্কৃতি হারিয়ে যায়। মধ্যবিত্ত সমাজ রবীন্দ্রনাথকে সাংস্কৃতিক ছাঁকনি (Filter) হিসেবে ব্যবহার করেন। যা দিয়ে তারা কেবল সেইসব চিন্তা বা শিল্পকে গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচনা করেন যা তাদের কাছে রাবীন্দ্রক-নান্দনিকতার মাপে মাপে খাপ খায়। এটি একটি জনগোষ্ঠীর আবহমান কালের মননের ওপর চালানো এক প্রকার (intellectual genocide) বা বুদ্ধিবৃত্তিক গণহত্যা।
২. মধ্যবিত্তের ‘বাবুয়ানা’ ও টটেম-বন্দনা
পূর্ব বাংলার শিক্ষিত মধ্যবিত্তের একটি বড় অংশের মনস্তাত্ত্বিক ইতিহাস হলো তাদের গ্রামীণ ও কৃষক সত্তাকে অস্বীকার করার ইতিহাস। তারা যখন নগরে থিতু হয়ে একটি ‘সুশীল’ পরিচয় নির্মাণ করতে সক্রিয়, তখন তাদের সামনে প্রধান বাধা তাদের ‘চাষা-ভূষার’ অতীত। রবীন্দ্রনাথ তাদের কাছে সেই সাংস্কৃতিক অতীত ভোলানোর পা
(Cultural Capital) বা সাংস্কৃতিক পুঁজি।
Sigmund Freud-এর ‘টটেম’ ধারণাটিকে বিবেচনায় নিলে বোঝা যায়, রবীন্দ্রনাথ এই শ্রেণির কাছে একটি ‘টটেম’। তারা এই টটেমের বন্দনা করেন। কারণ এটি তাদেরকে সাধারণ মানুষের চেয়ে ‘উন্নত’ ও ‘মার্জিত’ প্রমাণ করার সুযোগ তৈরি করে দেয়।
এই মধ্যবিত্তীয় ‘খোয়ারি’ বা মোহ আসলে এক ধরনের (Cultural Hubris) বা সাংস্কৃতিক ঔদ্ধত্য। কেউ যদি তাঁর জমিদারি প্যাটার্নালিজম নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তখন মধ্যবিত্ত সমাজ হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। এই আক্রমণাত্মক প্রতিক্রিয়াকে আসলে রবীন্দ্র-প্রেম নয়, বরং মেকি আভিজাত্য রক্ষার এক হিংস্র মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরক্ষা বলা যায়।
৩. ভাষার একনায়কতন্ত্র ও আঞ্চলিক সত্তার মৃত্যু
রাবীন্দ্রিক সহিংসতার সবচেয়ে দৃশ্যমান অথচ উপেক্ষিত দিকটি হলো ভাষা। রবীন্দ্রিক বাংলা’র শূচিতা রক্ষায় এই শিক্ষিত মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠী পূর্ব বাংলার হাজার বছরের আঞ্চলিক স্বরগুলোক বলি দিতেও কুণ্ঠিত নন।
Pierre Bourdieu একে বলেছেন ‘Symbolic Violence’ বা প্রতীকি সহিংসতা।
রবীন্দ্রনাথের ভাষা ও শৈলীকে ‘আদর্শ’ ধরে নেওয়ার ফলে এই অঞ্চলের মানুষের নিজস্ব বুলি, উচ্চারণ এবং ভাব প্রকাশের ভঙ্গিকে ‘অশুদ্ধ’ ও ‘হাস্যকর’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রবণতাকে উপেক্ষা করার কোন উপায় নেই। মধ্যবিত্ত সমাজের কন্ঠে রবীন্দ্রিক ভাষা চর্চা আসলে এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কৌশল। এর ফলে পূর্ববঙ্গের সাধারণ মানুষ আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলতে গিয়ে নিজেদের ঊণ মানুষ ভাবতে বাধ্য হন। আত্মপরিচয় নিয়ে প্রতিনিয়ত হীনম্মন্যতায় ভোগার যন্ত্রণা— কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। এটি একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর স্বকীয় সত্তাকে খুন করার নামান্তর।
৪. সংগ্রামের লিবিডো হরণ ও রাজনৈতিক নির্লিপ্ততা
রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য মূলত এক ধরণের ‘সাবলিমেশন’ (Sublimation) বা রূপান্তরের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। তিনি জীবনের রূঢ়তাকে, দারিদ্র্যকে বা শ্রেণিক্রোধকে নান্দনিক বিষাদে রূপান্তর করেন। পূর্ব বাংলার ইতিহাস হলো রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের।
কখনো প্রকৃতির বিরুদ্ধে, কখনো অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে, পূর্ব বাংলার মানুষকে সংগ্রাম হতে রাখতে হয়েছে। তারা জমিদারী প্রথার বিরুদ্ধে, ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। কিন্তু রবীন্দ্রিক-আচ্ছন্নতা এই অঞ্চলের মানুষের সেই (Revolutionary Drive) বা বিপ্লবী সংগ্রামকে নান্দনিকতার মোড়কে আড়াল করতে চেয়েছে ।
রবীন্দ্র-বন্দনা মানুষকে ‘অন্তরের মুক্তি’র প্রেরণা দেয়, যা মূলত বাইরের শৃঙ্খলকে টিকিয়ে রাখার এক চমৎকার উন্মাদনা। যখন সমাজ বা রাষ্ট্রে কোনো চরম অবিচার ঘটে, তখন মধ্যবিত্ত সমাজ রবীন্দ্র-সঙ্গীতের ‘নান্দনিক প্রশান্তি’তে ডুবে গিয়ে নিজেদের নাগরিক দায়িত্ব শেষ করার তৃপ্তিতে মহাবিষ্ট হয়।
Herbert Marcuse এ প্রকৃতির মানুষদের (One-Dimensional Man) বা একমাত্রিক মানুষ বলেছেন। রবীন্দ্র-বন্দনা আসলে বাংলাদেশে সেই একমাত্রিক মানুষের কারখানা তৈরি করে। যারা অন্যায়ের প্রতিবাদ করার বদলে ‘নান্দনিক দূরত্ব’ বজায় রাখাকেই প্রগতিশীল দায়িত্ব মনে করে।
৫. প্রাদেশিকভাবে রবীন্দ্রনাথ: ‘পরবাসী’ আধুনিকতা
ভৌগোলিক ও প্রাদেশিক বিচারে রবীন্দ্রনাথ পূর্ববঙ্গের মানুষকে দেখেছেন একজন ‘আউটসাইডার’ হিসেবে। তাঁর ছিন্নপত্র বা ছোটগল্পে পূর্ববঙ্গের গ্রাম এক চমৎকার ‘ল্যান্ডস্কেপ’, কিন্তু এখানকার মানুষ সেখানে কেবল ‘প্যাসিভ সাবজেক্ট’ বা নিষ্ক্রিয় চরিত্র মাত্র। এই অঞ্চলের মানুষের যে নিজস্ব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আকাঙ্ক্ষা রয়েছে, তা রবীন্দ্র-সাহিত্যের ‘বিশ্বজনীনতা’র আড়ালে ঢাকা পড়ে যায়।
শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজ এই ‘বিচ্ছিন্ন আধুনিকতা’কে পরমানন্দে আলিঙ্গন করেন। কারণ, এতে সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে মুক্তি মেলে। তারা রবীন্দ্রনাথকে দিয়ে এমন এক কাল্পনিক স্বদেশ নির্মাণ করে, যার সাথে মাটির এবং মানুষের কোনো সম্পর্ক নেই। এই জীবন-বিচ্ছিন্ন রোমান্টিকতা পূর্ববঙ্গের জন্য ক্ষতিকরই নয়, আত্মধ্বংসী। কারণ, এ বায়বীয় রোমান্টিকতা মানুষকে তার প্রকৃত সংকটগুলোকে বুঝতে দেয় না। বরং তার ভেতরে পলায়নপর মনোবৃত্তি তৈরি করে।
রবীন্দ্র-বন্দনার নামে চলমান এই সাংস্কৃতিক সহিংসতা আসলে পূর্ব বাংলার মানুষের নিজস্ব সত্তার বিকাশকে বাধাগ্রস্থ করে। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজ এক প্রকার ‘রোমান্টিক খোঁয়ারি’ তৈরি করে রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক দুর্গ নির্মাণ করে আক্রমণ পরিচালনা করেন। পূর্ব বাংলার নিজস্ব সাংস্কৃতিক বিকাশের লক্ষ্যে এই দুর্গ ভেঙে ফেলাটা জরুরী।
রবীন্দ্রনাথকে অতি-মূল্যায়নের প্রক্রিয়ায় আমরা আসলে আমাদের নিজেদের মাটির ইতিহাসকেই হারিয়ে ফেলেছি। রবীন্দ্রনাথকে তাঁর ঐতিহাসিক সীমাবদ্ধতায় স্থাপন করার মাধ্যমেই কেবল এই ভূখণ্ডের মানুষের স্বাধীন বুদ্ধিবৃত্তিক মুক্তি সম্ভব।
#রবীন্দ্র #কবিতা #সাহিত্য #ছিন্নপত্র




প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ”" গণপূর্ত অধিদপ্তরে জালিয়াতি ও বদলি বাণিজ্য সিন্ডিকেট’র গডফাদার খালেকুজ্জামান কি আইনের উর্ধ্বে
বিআইডব্লিউটিএ বঙ্গবন্ধু পরিষদ সভাপতি দুর্নীতিবাজ ছাইদুর’র জিয়া পরিষদ সভাপতির পদ পেতে লবিংয়ে ব্যস্ত!
“”প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ”" গণপূর্ত’র দুর্নীতির সিন্ডিকেট সাম্রাজ্য ৫০ কোটি টাকার লেনদেন’র অভিযোগে তোলপাড়
নেতৃত্ব সংকট দূর করতে শীঘ্রই জাতীয়তাবাদী মৎস্যজীবী দল পুনর্গঠন
ভারত থেকে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বেনাপোল সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি
রোমানিয়ায় অনাস্থা ভোটে সরকারের পতন, অর্থনীতি ও রাজনীতিতে অনিশ্চয়তা বাড়ছে
দুর্নীতির বাদশা বিএডিসি ডিডি দীপক কুমার কি আইনের উর্ধ্বে
এখনো বহাল তবিয়তে সাবেক নৌ প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ’র আস্থাভাজন দুর্নীতিবাজ ছাইদুর রহমান
রূপগঞ্জে পুলিশের উপর হামলা চালিয়ে হাতকড়াসহ আসামী ছিনতাই ওসিসহ ৬ পুলিশ আহত ৭রাউন্ড ফাঁকা গুলিবর্ষণ গ্রেফতার-১২